সকাল-সন্ধ্যায় সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত পড়ার আমল ও ফজিলত
সকাল কিংবা সন্ধ্যায় মাত্র কয়েক মুহূর্ত সময় বের করে সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত তেলাওয়াত করা একজন মুসলিমের জন্য আল্লাহর কালামের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার একটি সুন্দর সুযোগ। বিশেষ করে সূরা হাশরের ২২, ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলার অসংখ্য মহান নাম ও গুণাবলি অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে।
অনেকের কাছেই সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াতের ফজিলত, সকাল-সন্ধ্যার আমল এবং ৭০ হাজার ফেরেশতার বর্ণনা সম্পর্কে জানতে আগ্রহ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রচলিত একটি হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাই আমল করার পাশাপাশি হাদিসের সঠিক অবস্থান জানাও গুরুত্বপূর্ণ।
সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত কোনগুলো?
সূরা হাশর কুরআনের ৫৯ নম্বর সূরা। এর শেষ তিন আয়াত হলো ২২, ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াত। এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলার পরিচয়, তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা, মহত্ত্ব এবং বহু সুন্দর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যমান সবকিছু সম্পর্কে অবগত। তিনি পরম দয়ালু, পরম করুণাময়।”
— সূরা আল-হাশর: ২২
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলার আরও কয়েকটি মহান নাম উল্লেখ করা হয়েছে—যেমন আল-মালিক, আল-কুদ্দুস, আস-সালাম, আল-মু’মিন, আল-মুহাইমিন, আল-আজিজ, আল-জাব্বার ও আল-মুতাকাব্বির।
শেষ আয়াতে আসমান-জমিনের সবকিছু আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করার কথা বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন ঃ
- এই ৫ ধরনের মানুষকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না!
- আপনি কি চান – আপনার পকেটের টাকা কখনো ফুরাবে না? তাহলে এই আমলটি করুন
সকাল-সন্ধ্যায় কীভাবে আমল করবেন?
প্রচলিত বর্ণনায় সকালবেলায় প্রথমে তিনবার পড়ার কথা এসেছে:
أَعُوذُ بِاللَّهِ السَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
উচ্চারণ:
আউযু বিল্লাহিস সামী‘ইল আলীমি মিনাশ শাইতানির রাজীম।
এরপর সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত—অর্থাৎ ৫৯:২২–২৪—তেলাওয়াত করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
বর্ণনাটিতে সকাল ও সন্ধ্যা উভয় সময়ের কথা এসেছে। তবে এই নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে নিশ্চিতভাবে সহিহ সুন্নাহ হিসেবে প্রচার করার আগে হাদিসটির মান সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত।
৭০ হাজার ফেরেশতার বর্ণনাটি কি সহিহ?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা দরকার। মাকিল ইবনু ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে সকালবেলায় তিনবার উল্লিখিত আশ্রয় প্রার্থনা করে সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পড়ার সঙ্গে ৭০ হাজার ফেরেশতা নিযুক্ত হওয়া এবং তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করার কথা এসেছে। একই বর্ণনায় সেদিন মৃত্যু হলে শহীদের মর্যাদার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই বর্ণনাটি জামে আত-তিরমিজি ২৯২২-এ রয়েছে।
তবে তিরমিজি বর্ণনাটিকে গরীব বলেছেন এবং প্রচলিত কিছু হাদিস-গ্রেডিংয়ে এটিকে দুর্বল (দাঈফ) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ইসলামQA-তেও এই নির্দিষ্ট ফজিলতের হাদিসকে দুর্বল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই “সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পড়লেই নিশ্চিতভাবে ৭০ হাজার ফেরেশতা দোয়া করবেন”—এভাবে অকাট্য সহিহ হাদিসের বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
তাহলে কি সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পড়া যাবে?
অবশ্যই, কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা নিজেই মহান ইবাদত। বিশেষ করে এই তিন আয়াতে আল্লাহর তাওহিদ, মহত্ত্ব এবং সুন্দর নাম ও গুণাবলি স্মরণ করা হয়েছে।
তাই একজন মুসলিম কুরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর জিকির এবং আল্লাহর নাম স্মরণের সাধারণ সওয়াবের আশায় এসব আয়াত পড়তে পারেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট ফজিলতকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহিহ বাণী হিসেবে প্রচার করার ক্ষেত্রে অবশ্যই হাদিসের মান যাচাই করা জরুরি।
সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত থেকে আমাদের শিক্ষা
এই আয়াতগুলো শুধু মুখস্থ করে পড়ার বিষয় নয়; এগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টাও করা উচিত।
প্রথমত, আল্লাহই একমাত্র ইলাহ—তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সবকিছু সম্পর্কে অবগত।
তৃতীয়ত, আল্লাহর অসংখ্য সুন্দর নাম রয়েছে এবং তাঁর গুণাবলি স্মরণ করলে ঈমান ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পেতে পারে।
চতুর্থত, আসমান-জমিনের সবকিছু আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে।
উপসংহার
সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত পড়ার আমল নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। সকাল ও সন্ধ্যায় কুরআন তেলাওয়াত এবং আল্লাহর জিকিরের অভ্যাস একজন মুমিনের জীবনে নেক আমলের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
তবে ৭০ হাজার ফেরেশতা ও শহীদের মর্যাদা সম্পর্কিত নির্দিষ্ট বর্ণনাটি দুর্বল হিসেবে গ্রেড করা হয়েছে—তাই এটিকে নিশ্চিত সহিহ ফজিলত হিসেবে প্রচার না করাই সতর্কতার পথ।
আসুন, শুধু ফজিলতের আশায় নয়—আল্লাহকে চেনা, তাঁর সুন্দর নামগুলো স্মরণ করা এবং কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার উদ্দেশ্যে সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত তেলাওয়াত করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআন বুঝে পড়া, আমল করা এবং তাঁর নৈকট্য অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
